☰ পুরনো সংখ্যা
☰ সূচি

ভারতে নতুন শিক্ষানীতি ও আমাদের উদ্বেগ

ওয়াসি সুলাইমান নদবি


কিছু দিন যাবত সরকারের তরফ থেকে নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে বেশ জোরালোভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছিলো, যা বিগত বিশ সালের উনত্রিশে জুলাই ভারতের পার্লামেন্টে পাস হয়েছে। নতুন শিক্ষানীতিতে এমন অনেক বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষ করে মুসলমানদের দ্বীনদারি ও ঈমানের জন্য আশঙ্কাজনক। পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুমান করে, ‘ইমারতে শরিয়াহ বেনারস’ এর পক্ষ থেকে নতুন শিক্ষনীতির একটি উর্দু অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। অনুবাদের প্রচারণাও খুব জোরালোভাবে হয়েছে, যেন সবাই এটাকে দেখে চিন্তা-ভাবনা করে।
বর্তমানে ভারতের মুসলিমরা নানাবিদ সমস্যায় জর্জরিত। বাবরি মসজিদ, লাভ জিহাদ, গো রক্ষার নামে মুসলিম হত্যা, আসাম থেকে মুসলিম বিতাড়ন ও কাশ্মীর সমস্যা এর মধ্যে অন্যতম। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মুসলমানরা অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এখন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে শিক্ষানীতি।
সাইয়েদ মাওলানা মুহাম্মাদ ওলি রাহমানি একজন যুগ সচেতন আলেম হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তিনি ‘মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড’ এর জেনারেল সেক্রেটারি। ভারতের নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি একটি লেখা পোস্ট করেছেন। তার লেখাটি খুবই ভাইরাল হয়েছে। মুসলমানদের তরফ থেকে রাষ্ট্রের সব ঘোষণা বা নীতির বিরোধিতা যেমন অনুচিত, তেমনিভাবে শঙ্কা ও উদ্বেগের বিষয়গুলোতে চুপ থাকাও সভ্য কোন জাতির জন্য উচিত হতে পারে না। এ জন্য মুসলিমদের কর্তব্য হচ্ছে, এ বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ও ক্ষতিকর দিকগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য করণীয়গুলো ঠিক করা।
নতুন শিক্ষানীতিতে পঞ্চম শ্রেণির উপর থেকে তিন ভাষার ফর্মুলার কথা বলা হয়েছে। ভারতে বহু ভাষা রয়েছে, কিন্তু শিক্ষানীতিতে উল্লেখ্য তিন ভাষা দ্বারা কোন কোন ভাষা উদ্দেশ্য তা পরিস্কার করা হয়নি। হিন্দি রাষ্ট্রীয় ভাষা, ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা ও সংস্কৃত ভাষাকে জাগিয়ে তোলা বর্তমান বিজেপি সরকারের এজেন্ডা, তাই শিক্ষনীতিতে উল্লেখ্য তিন ভাষা দ্বারা যে এই তিন ভাষাই উদ্দেশ্য তা বুঝার আর বাকি নেই। শিক্ষানীতির বাইরে থেকে যাচ্ছে উর্দু ভাষা। বহু প্রদেশে উর্দু রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় ভাষা। ভারতের সংস্কৃতি উর্দুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তারপরও বর্তমান শিক্ষানীতির কোথাও উর্দুর কথা উল্লেখ নেই। শিক্ষানীতিতে উর্দুকে ওই মর্যাদা দেওয়া হয়নি, যা অন্যান্য ভাষাকে দেওয়া হয়েছে। বরং সরকারের পক্ষ থেকে যে সব ভাষাকে উন্নতি সাধনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, উর্দুকে সেগুলোরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ মরে যাওয়া প্রাচীন ভাষাসমূহকে জাগিয়ে তোলার জন্য বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহŸান জানানো হয়েছে এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষানীতিতে বারবার ‘রাষ্ট্রীয় ও ভারতীয়’ এ ধরণের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সাথে সাথে সিলেবাসে ‘জাতীয় ও ভারতীয়’ বিষয় অন্তর্ভুক্তির উপর জোর তাকিদ দেওয়া হয়েছে। ‘অজাতীয়, অভারতীয়’ বিষয়গুলোকে বাদ দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু ‘জাতীয়, ভারতীয়’ ও ‘অজাতীয়, অভারতীয়’ শব্দগুলো দ্বারা কোন বিষয়গুলো উদ্দেশ্য তা স্পষ্ট করা হয়নি। সম্ভবত অরাষ্ট্রীয়, অজাতীয় বিষয় দ্বারা বর্তমান সিলেবাসের মুসলিমদের বিষয়গুলো বুঝানো হয়েছে। যেখানে মুসলমান শাসকদের ভারত শাসনের বিষয়টিও অন্তর্ভুূক্ত। তাই এগুলো বাদ দিয়ে ‘জাতীয় ও ভারতীয়’ তথা হিন্দুত্ববাদের চেতনা জেগে ওঠার মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। এ জন্য শিক্ষানীতিতে অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যেন পরবর্তীতে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।
শিক্ষানীতির যে সব বিষয় নিয়ে আপত্তি ওঠেছে, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষানীতিতে সংখ্যালঘুদের শিক্ষাদীক্ষার কোন আলোচনা করা হয়নি। তাতে শামিল করা হয়নি এমন কোন নীতি, যা পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দ্বীন-ধর্মকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে। মকতব, মাদরাসা ও পাঠশালাসহ এ জাতীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আলোচনাও শিক্ষানীতিতে স্থান পায়নি। অন্যদিকে দেবদেবীদের কল্পিত গল্প-কাহিনীকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করতে জোর তাকিদ দেওয়া হয়েছে। কেমন যেন ভারত কোন সাধারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় বরং বিশেষ ধর্মের অনুসারীদের রাষ্ট্র। অন্য সব ধর্মের কৃষ্টি-কালচার, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট একটি ধর্মের উন্নতি ও অগ্রগতির উপর জোর দেওয়া দ্বারা মনে হচ্ছে যে, নতুন শিক্ষানীতি জাতিকে এক ধর্মের দিকে ধাবিত করার নতুন প্রয়াস। আর সেটা হচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদ।
মাওলানা ওয়ালি রাহমানির পোস্টের একটা অংশ ছিলো ‘খুব দ্রæতই ওই সময় চরে আসছে যখন মকতব, মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভকারীদেরকে ‘আর এস’ এর রাজাকাররা ধরে ধরে স্কুলে দিয়ে আসবে এবং মুসলিম সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার চলমান ধারাও বন্ধ হয়ে যাবে। তার পেছনের কারণটাও বুঝতে কারো সমস্যা নেই। অনেকে বুঝে ফেলেছেন সম্ভবত। বর্তমান সরকার যুবকদের জন্য কোন কর্মসংস্থান করতে পারছে না। ব্যর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থের জোগান দিতে। দেশের অর্থনীতির সার্বিক অবস্থাও ভালো নয়। সব মিলিয়ে সরকার চতুর্মুখী চাপে থাকায় বিকল্প হিসেবে লাঠিয়াল বাহিনী তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছে, যেন মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।
মাওলানা রাহমানি উল্লেখ করেছেন যে, পÐিত নেহেরুর সময়ও ‘আবশ্যকীয় স্কুল শিক্ষা’ পরিকল্পনার কারণে মকতব, মাদরাসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। তখন মাওলানা মিন্নাতুল্লাহ রাহমানিসহ অনেক আলেম, সরকারের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং মকতব, মাদরসাকেও আবশ্যকীয় শিক্ষার অংশ হিসেবে শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানিয়ে নিজেদের বক্তব্য তোলে ধরেন। তখন সরকার বিষয়গুলোকে ইতিবাচক হিসেবে নেয়। পরে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো যখন ‘রাইট টু এডুকেশন এ্যাকট’ পাশ হয়। ওই আইনে ছয় থেকে আঠারো বছরের ছেলে মেয়েকে স্কুলে পড়তে বাধ্য করা হয়। তখনও আন্দোলন ও আলোচনার সমন্বয়ের দ্বারা শিক্ষানীতি সংশোধন করতে সক্ষম হয়েছিলো। আশা করছি এবারও আমরা সফল হবো। আর আমাদের করণীয় হচ্ছে ‘তোমরাই সফল হবে যদি তোমরা খাঁটি ঈমানের অধিকারী হও’ এই আয়াতের শিক্ষাকে ধারণ করা।

অনুবাদ: শহীদুল ইসলাম